মানুষ আল্লাহর খলীফা ও বান্দা। খেলাফত ও উবুদিয়্যাতের দায়িত্ব যথাযথভাবে আঞ্জাম দেয়ার উপরই মানুষের দুনিয়ার সামগ্রিক কল্যাণ এবং আখেরাতের মুক্তি ও শান্তি নির্ভরশীল।
ইসলাম মানুষের জন্য মনোনীত দ্বীন ও সর্বোত্তম জীবন ব্যবস্থা। ইবলিসী চক্রান্তে সৃষ্ট শোষণ-নির্যাতন, নৈরাজ্য, অনৈক্য-বিভেদ, অন্যায়-অবিচার-অনাচার, যুদ্ধ-সংঘাতে পরিপূর্ণ বিপর্যস্ত পৃথিবীর হতাশাগ্রস্ত মানুষের একমাত্র মুক্তির পথ এ ইসলাম। সমাজের সর্বস্তরে ইসলামের পূর্ণ প্রতিষ্ঠাই শান্তি, অগ্রগতি, সুবিচার ও সাম্যের নিশ্চয়তা দিতে পারে।
বর্তমানে উলামা-মাশায়েখ ও দ্বীনদারশ্রেণীর মাধ্যমে ইসলামের বিভিন্ন পরিমন্ডলে ইসলামের বাস্তবরূপ তথা খেলাফত ব্যবস্থা কায়েম নেই দীর্ঘদিন ধরে। অথচ ইসলামের সার্বিক প্রতিষ্ঠা ও কল্যাণকারিতা এবং সাধারণভাবে গোটা মানবতার বিশেষভাবে মুসলিম বিশ্বের মুক্তি, সমৃদ্ধি, সম্মান ও মর্যাদা নিহিত রয়েছে খেলাফত ব্যবস্থাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার মধ্যে। এ দায়িত্ব গোটা মুসলিম জাতির, বিশেষভাবে উলামা-মাশায়েখ, দ্বীনদার বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিকদের।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ সত্য সমভাবে প্রযোজ্য। এখানকার সামাজিক বৈষম্য, অর্থনৈতিক শোষণ, রাজনৈতিক নিপীড়ন, হানাহানি, সাংস্কৃতিক নৈরাজ্য ও দেউলিয়াপনা এবং বৈদেশিক আধিপত্যের অবসানে গোটা সমাজব্যবস্থাকে ইসলামের আলোকে পুনর্গঠিত করতে হবে। দেশের ষোল কোটি মানুষের কল্যাণ ও সমৃদ্ধির জন্য ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে সমাজের বিপ্লবাত্মক পরিবর্তন তথা একটি ইসলামী বিপ্লব প্রয়োজন। প্রয়োজন একটি সার্বজনীন কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত করা। এ শুধু পার্থিব প্রয়োজনেই নয় বরং আখেরাতের মুক্তির জন্যও অপরিহার্য।
বাংলার যমীনে আল্লাহর খেলাফত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এ দেশের ইসলামী আন্দোলনের ক্ষেত্রে এক নবতর সমন্বয়ধর্মী ও গণভিত্তিক ঐতিহ্য-চেতনা সমৃদ্ধ আপসহীন নির্ভেজাল ইসলামী আন্দোলন গড়ে তোলার প্রয়োজনে ১৯৮৯ সালের ৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আত্মপ্রকাশ।
আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে দুনিয়া এবং আখেরাতের মুক্তি ও প্রকৃত কল্যাণ লাভের উপায় হিসেবে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস প্রচলিত অনৈসলামী সমাজ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন সাধন করে কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে এবং খেলাফতে রাশেদার দৃষ্টান্তের অনুসরণে প্রথমে বাংলাদেশে একটি ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা তথা আল্লাহর খেলাফত প্রতিষ্ঠা এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে সমগ্র দুনিয়ায় আল্লাহর খেলাফত প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করতে চায়।
১. দাওয়াত: পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে দ্বীনের ব্যাপক প্রচার-প্রসার ও
খেলাফত প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব তুলে ধরা এবং জীবনের সর্বস্তরে দ্বীনবাস্তবায়নের লক্ষ্যে জনগণকে সচেতন ও উদ্বুদ্ধ করা।
২.সংগঠন: খেলাফত প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী সর্বস্তরের জনগণকে খেলাফতমজলিসের আওতায় সংঘবদ্ধ করা।
৩. প্রশিক্ষণ: খেলাফত মজলিসের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল পর্যায়ের জনশক্তির আদর্শিক সচেতনতা ও কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি, তাদের আধ্যাত্মিক, নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মান-উন্নয়নের মাধ্যমে উপযুক্ত কর্মীরূপে গড়ে তোলা।
৪. নেতৃত্ব: প্রচলিত সমাজ কাঠামোর পরিবর্তনের লক্ষ্যে আদর্শহীন সুবিধাবাদী, দুর্নীতিপরায়ণ, ফাসেক ও স্বৈরাচারী নেতৃতের অবসান ঘটিয়ে জনগণের আস্থাভাজন হক্কানী উলামা, দ্বীনদার-রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের সমন্বিত নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো।
৫. ঐক্য: মুসলিম উম্মাহর সর্বপ্রকার বিরোধ-বিভেদ অবসান এবং ইসলামের জন্য কর্মরত বিভিন্ন দল, সংগঠন, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা ও ব্যক্তিবর্গকে ঐক্যবদ্ধ করার প্রচেষ্টা চালানো।
৬. মানবতার সেবা: শোষিত-বঞ্চিত-মজলুম নারী, পুরুষ ও শিশুদের সকল প্রকার ন্যায্য অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে সংগ্রাম করা এবং আর্ত-মানবতার সেবায় সচেষ্ট থাকা।
৭. সংখ্যালঘুদের অধিকার: সংখ্যালঘু সম্প্রদায়সমূহের মৌলিক, মানবিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অধিকারসমূহ সংরক্ষণ এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার প্রচেষ্টা চালানো।
৮. সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রাম: সা¤্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ ও
আধিপত্যবাদের বিরোধিতা, মুক্তিকামী মজলুম জাতিসমূহের পক্ষালম্বন এবং সমমর্যাদার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার পক্ষে বিশ্ব জনমত গঠন।
৯. গণআন্দোলন : কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে সমাজ কাঠামোর পরিবর্তন, জনগণের সকল প্রকার মৌলিক ও মানবিক অধিকার সংরক্ষণ ও নিশ্চিতকরণ তথা খেলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ব্যাপক জনমত তৈরী ও গণআন্দোলন গড়ে তোলা।
যে কোনো ব্যক্তি খেলাফত মজলিসের আদর্শ, উদ্দেশ্য ও কর্মসূচীর সাথে একমত হয়ে সংগঠনের নির্ধারিত ফরম পূরণ করে যোগদান করলে তিনি সদস্যভুক্ত হবেন।
যে সদস্য সংগঠনের নিয়মিত দাওয়াতী কাজ, সংগঠনের ঘোষিত কর্মসূচিতে অংশ গ্রহণ, এয়ানত প্রদান এবং শৃংখলা মেনে চলবে। তিনি কর্মী হওয়ার উপযুক্ত বলে গণ্য হবেন। নির্ধারিত ফরম পূরণ করে কর্মী হওয়ার আবেদন করতে হবে।
যে কর্মী নিম্নলিখিত শর্তাবলী পূরণ করবেন তিনি খেলাফত মজলিসের নকীব হওয়ার যোগ্য হবেন।
কেন্দ্রীয় সংগঠন : আমীরে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, অভিভাবক পরিষদ, কেন্দ্রীয় সাধারণ পরিষদ, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ
সমন্বয়ে কেন্দ্রীয় সংগঠন গঠিত হবে।
আমীরে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস : সংগঠন প্রধানের নাম আমীরে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। তিনি দুই বছরের জন্য কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা কর্তৃক নির্বাচিত হন। তাকে সার্বিক সহযোগিতা করার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক নায়েবে আমীর রয়েছেন।
অভিভাবক পরিষদ : আন্দোলন ও সংগঠনের আদর্শিক দিক-নির্দেশনা এবং শরীয়ত অনুসৃত বিষয় তত্ত্বাবধান ও পর্যবেক্ষণের জন্য দেশের প্রখ্যাত ও বিজ্ঞ আলেম এবং ইসলামী চিন্তাবিদগণের মধ্য থেকে অনধিক এগারো সদস্য বিশিষ্ট একটি অভিভাবক পরিষদ থাকবে।
কেন্দ্রীয় সাধারণ পরিষদ : অভিভাবক পরিষদ, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা ও জেলা নির্বাহী পরিষদের সকল সদস্য, থানা সভাপতি, সহ-সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং খেলাফত মজলিসের নকীব পদপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণ সমন্বয়ে কেন্দ্রীয় সাধারণ পরিষদ গঠিত হয়। সংগঠন ও আন্দোলনের কার্যক্রম পর্যালোচনা, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতবিনিময় এবং পরামর্শদানই কেন্দ্রীয় সাধারণ পরিষদের কাজ।
কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা : আন্দোলন ও সংগঠনের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী সংস্থা হচ্ছে কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা। কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সকল সদস্য, জেলা শাখার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক, নকীব এবং দুই বছরের জন্য সর্বোচ্চ পঞ্চাশজন মনোনীত সদস্য সমন্বয়ে মজলিসে শূরা গঠিত হয়।
কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ : আমীরে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, প্রয়োজনীয় সংখ্যক নায়েবে আমীর, একজন মহাসচিব, এক বা একাধিক যুগ্ম মহাসচিব, এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিভাগীয় সম্পাদক নিয়ে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ গঠিত হয়। সংগঠন ও আন্দোলনের কার্যক্রম পরিচালনা এবং মজলিসে শূরায় গৃহীত সিদ্ধান্ত ও কর্মসূচী বাস্তবায়নই কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের দায়িত্ব।
বায়তুলমাল : বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রত্যেক সাংগঠনিক স্তরে বায়তুলমাল বা তহবিল থাকবে। নকীব, কর্মী, সদস্য ও শুভাকাক্সক্ষীদের নিকট থেকে প্রাপ্ত মাসিক এয়ানত ওশর-যাকাত, এককালীন দান, অধঃস্তন শাখা থেকে প্রাপ্ত র্নিধারিত আয়, সংগঠনের প্রকাশনার মুনাফা এবং সংগঠনের মালিকানাধীন সম্পত্তির আয়ই হচ্ছে বায়তুলমালের আয়ের উৎস। আয়-ব্যয়ের যথাযথ হিসাব সংরক্ষণ, হিসাব নিরীক্ষক দ্বারা হিসাব পরীক্ষা করানো, নিরীক্ষা রিপোর্ট মজলিসে শূরায় পেশ করা সবকিছুই সংগঠনের
গঠনতন্ত্র দ্বারা বিধিবদ্ধ।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস হচ্ছে এদেশের সমস্যাপীড়িত ও হতাশাগ্রস্ত জনতার আশার প্রতীক। উলামায়ে হক ও দ্বীনদার বুদ্ধিজীবী-রাজনীতিকগণের আকাক্সিক্ষত সংগঠন, দিশেহারা মানুষের পথ নির্দেশক, অর্থনৈতিকতার পঙ্কিল আবর্তে নিপতিত মানুষের পরিশুদ্ধিস্থল, মজলুম মুস্তাদআফীন শ্রেণীর মুক্তির কাফেলা, দেশের ঐতিহ্য সচেতন মানুষের আশ্রয়, শতধাবিভক্ত মুসলিম জনতার ঐক্যের সূত্র, স্বাধীনতার অতন্দ্র প্রহরী, দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণবাহী এক বিপ্লবী আন্দোলন। আসুন! আমরা সবাই জেগে উঠি। আল্লার রজ্জুকে সবাই মিলে আঁকড়ে ধরি। নিজেদের আমলনামায় সঞ্চয় করি। সাথে সাথে এদেশের বঞ্চিত-দুঃখী মানুষদেরকে জাগিয়ে তুলি, ন্যায়ের পথে অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক প্রচ- আন্দোলন গড়ে তুলি। আল্লাহর যমীনে আল্লাহর খেলাফত কায়েমের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করি। নিজেদেরকে আল্লাহর রঙে রাঙিয়ে তুলি। জিহাদ ও শাহাদাতের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আখেরাতের মুক্তি লাভের প্রত্যাশায় দুনিয়ার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চাওয়া-পাওয়া পরিহার করি। আমরা যদি নিজেদেরকে সংগঠিত করতে পারি, সত্যিকার মুসলমান ও মুজাহিদরূপে গড়ে তুলতে সক্ষম হই, তাহলে এদেশে খেলাফত কায়েমের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। উন্মোচিত হবে ইসলামী বিপ্লবের নতুন দিগন্ত, রচিত হবে মুক্তির রাজপথ। আসুন! আমরা ঈমানের বল, খোদায়ী জ্ঞানের হাতিয়ার ও উত্তম চরিত্রের পুঁজি সম্বল করে একমাত্র আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল রেখে এগিয়ে যাই আল্লাহর যমীনে আল্লাহর খেলাফত কায়েমের সুগভীর স্বপ্ন বাস্তবায়নে। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। আমীন।
ইসলামী সমাজব্যবস্থার অনুপস্থিতিতে সৃষ্ট নৈরাজ্য ও হতাশার বিপরীতে, বাংলার যমীনে আল্লাহর খেলাফত প্রতিষ্ঠার এক আপসহীন আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে ১৯৮৯ সালের ৮ ডিসেম্বর আমাদের পথচলা শুরু হয়।
© ২০২৫ – বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।