সদস্য হোন
সদস্য হোন

প্রিন্সিপাল হাফেজ মাওলানা হাবিবুর রহমান রহ.

প্রিন্সিপাল হাফেজ মাওলানা হাবিবুর রহমান রহ.

সাবেক আমীর – বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস
(মেয়াদকাল: ২০১২-২০১৮ ইং)

জন্ম ও বংশপরিচয়:

হাফেজ মাওলানা হাবিবুর রহমান রহ. ১৯৪৯ সালে সিলেট জেলার গোলাপগঞ্জ উপজেলার ফুলবাড়ী ইউনিয়নের ঘনশ্যাম গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি এক সম্ভ্রান্ত ও ধর্মপরায়ণ মুসলিম পরিবারে বেড়ে ওঠেন। তাঁর পিতা মুন্সি মাহমুদ আলী ছিলেন সিলেট হাওয়াপাড়া জামে মসজিদের ইমাম ও খতীব এবং জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সক্রিয় নেতা। তাঁর নানাজি ছিলেন খ্যাতিমান আলেম মাওলানা ফজলুল করিম। পরিবারিক পরিবেশেই তিনি ইসলামের প্রতি অনুরাগী হয়ে ওঠেন এবং শৈশব থেকেই দ্বীনের প্রতি গভীর টান অনুভব করেন।

শিক্ষাজীবন:

প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন বইটিকর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এরপর রুস্তমপুর কওমি মাদরাসায় শিক্ষা শুরু করেন। অল্প বয়সেই তিনি কুরআন হিফজ সম্পন্ন করে একজন পূর্ণাঙ্গ হাফেজে কুরআন হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন।
পরে ফুলবাড়ী আলিয়া মাদরাসায় ভর্তি হয়ে ১৯৭০ সালে ফাযিল ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৭৩ সালে সিলেট সরকারি আলিয়া মাদরাসা থেকে কামিল পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেন, যা তাঁর অসাধারণ মেধা ও যোগ্যতার বহিঃপ্রকাশ। এর মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেন যে তিনি কেবল একজন কওমি আলেম বা হাফেজই নন, বরং আধুনিক ইসলামী শিক্ষায়ও সমানভাবে কৃতিত্বের অধিকারী।

কর্মজীবন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান:

১৯৭৩ সালে তিনি কাজির বাজার পেয়াজহাটা জামে মসজিদে ইমাম ও খতীব হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।
১৯৭৪ সালে দারুল উলুম দেওবন্দের আদর্শে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন জামেয়া মাদানিয়া কাজির বাজার মাদরাসা। শুরুতে এটি একটি ছোট প্রতিষ্ঠান হলেও তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম, ত্যাগ ও দূরদর্শী নেতৃত্বে মাদরাসাটি দ্রুত অগ্রগতি লাভ করে। বর্তমানে এটি সিলেটসহ সারাদেশে একটি মর্যাদাপূর্ণ ও স্বনামধন্য কওমি মাদরাসা হিসেবে পরিচিত।
তিনি আমৃত্যু এই মাদরাসার অধ্যক্ষ (প্রিন্সিপাল) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং হাজারো আলেম তৈরির মাধ্যমে ইসলামের জ্ঞান প্রচার ও প্রসারে অবিস্মরণীয় অবদান রেখে যান।

রাজনীতি ও আন্দোলন:

মাওলানা হাবিবুর রহমান রহ. ছিলেন শিক্ষকতার পাশাপাশি এক প্রগাঢ় আন্দোলনপ্রবণ নেতা।

প্রথমে তিনি জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ-এর রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন এবং ১৯৭৭–১৯৮১ সাল পর্যন্ত সিলেট জেলা জমিয়তের সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

পরবর্তীতে হযরত হাফেজ্জী হুজুর রহ. প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন-এ যোগ দেন। ১৯৮১ সালে হাফেজ্জী হুজুর রহ. রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে তিনি সফরসঙ্গী হয়ে দেশব্যাপী প্রচারণায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

১৯৯৪ সালে তসলিমা নাসরিনের নাস্তিকতাবাদী লেখার বিরুদ্ধে দেশব্যাপী ঐতিহাসিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। তিনি “সাহাবা সৈনিক পরিষদ” গঠন করে সারাদেশে ইসলামী জনজাগরণ সৃষ্টি করেন।

খেলাফত আন্দোলন বিভক্ত হলে তিনি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসে যোগ দেন এবং শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ.-এর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করেন।

আমীরের দায়িত্ব:

২০১২ সালে শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ. ইন্তেকাল করলে কেন্দ্রীয় শূরা মাওলানা হাবিবুর রহমান রহ.-কে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর নির্বাচিত করে। তাঁর আমীরত্বকালীন সময়ে—

কওমি মাদরাসার দাওরায়ে হাদিস সনদকে মাস্টার্স সমমানের সরকারি স্বীকৃতি আদায়ে তিনি ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখেন।

খেলাফত মজলিসকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করতে সচেষ্ট থাকেন।

ইসলামী মূল্যবোধ রক্ষায় দেশব্যাপী গণআন্দোলন পরিচালনা করেন এবং ইসলামপ্রেমী জনতার ঐক্য গড়ে তুলতে অবদান রাখেন।
তিনি দৃঢ় নেতৃত্ব, প্রজ্ঞা ও ত্যাগের মাধ্যমে দলের আমীর হিসেবে দেশের ইসলামী আন্দোলনের ইতিহাসে উজ্জ্বল অধ্যায় রচনা করেন।

ইন্তেকাল:

২০১৮ সালের ১৯ অক্টোবর তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তাঁর ইন্তেকালে কেবল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস নয়, বরং সমগ্র দেশের ইসলামী অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে।
সিলেট আলিয়া মাদরাসার সুবিশাল মাঠ, আশপাশের সড়ক-মহাসড়ক ও অলিগলি মিলিয়ে লক্ষাধিক মানুষের উপস্থিতিতে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এই অভূতপূর্ব দৃশ্য প্রমাণ করে তিনি জনমানসে কতটা গভীরভাবে স্থান করে নিয়েছিলেন।

অবদান ও উত্তরাধিকার:

মাওলানা হাবিবুর রহমান রহ. ছিলেন— একাধারে একজন মুজাহিদ, খাঁটি আলেম, দূরদর্শী সংগঠক, প্রজ্ঞাবান শিক্ষাবিদ, এবং ত্যাগী রাজনৈতিক নেতা।

বাংলাদেশে ইসলামী আন্দোলনের প্রসার, কওমি মাদরাসার উন্নয়ন, ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশ এবং ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তাঁর অবদান ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।